আমাদের বাড়ির প্রবেশ দরজা পেরিয়ে পরে একটি বারান্দা। তারপর পরে একটি মাঝের দরজা। সেই দরজা পেরিয়ে আর একটি বারান্দা। সেইটা দিয়ে সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলে একটি ছোটো ঘরের পাশের সিঁড়ি দিয়ে উঠেই এই ঘরটি পরে। যে ঘরে এতদিনের সব কিছু হয়ে উঠেছে জীর্ণ। এই ঘরটাতে একসময় আমি থাকতাম। ঘরের উওরে একটি বড় জানলা, দক্ষিণে একটি ছোটো জানালা ও দরজা। আসবাবপত্রের মধ্যে এখন আছে একটি খাট, ছোটো টেবিল, কিছু দেওয়াল সেল্ফ। একপাশে একটি ঠাকুরের সিংহাসন। সেল্ফগুলোতে কিছু পুতুল আর কিছু বই আছে। কিন্তু এত কিছুর পরেও এই ঘরটা আজ জীর্ণ কুটিরের মত।
যখন আমি ছিলাম এই ঘরে তখন একটা পড়ার টেবিল চেয়ার ছিল, যা আজ নেই।
অনেক দিন পরে আজ আবার এই ঘরে পা রাখলাম। একসময় এই ঘর ছিল আমার জীবনের দুঃখ, কষ্ট, স্বপ্ন, প্রেম ভালোবাসার এক ছোট্ট বাসা। এই সমস্ত কিছুই ছিল এই ঘরের চারটি দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ।
আমার আট বছর বয়স থেকে এই ঘর হয়ে উঠেছিল আমার প্রান বায়ু। তখন খাটের উপর দাদু নাতনিতে চলত পড়াশুনার পালা। কিন্তু তা ছিল সঠিক পড়াশুনার পথ থেকে অনেকটাই আলাদা। আমার দাদু ছিলেন বেশ পুরোনো যুগের আর অহংকারী। সেই জন্য আমি কোনোদিন বাড়ির বাইরে যেতে পারতাম না। সেই সময় বিকেলে বসে খাটের পাশে উত্তরী জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতাম পাশের বাড়ির উঠানে খেলতে থাকা অনেক বন্ধুদের দিকে, যারা আমাকে ডাকত। তারপর ক্রমে বড় হতে হতে চলল একের পর এক দুঃখ, পড়তে বসে দাদুর কাছে মার খাওয়া সব এই ঘরে। মার খেয়ে চোখ অন্ধ হতে হতে থেকে গিয়েছিল। তার কান্নাও ঘরের চারটি দেওয়াল জানে। সেই ছোটো থেকে বড় হওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, গান শোনা, ঠাট্টা, প্রতিদিনের পূজো সবই চলল এই ঘরে। এইভাবে কেটে গেল অনেক বছর। যখন বয়স আমার আঠারো তখন সবে উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে কলেজে ভর্তির পালা চলছে, সেই সময় থেকে এই ঘরটা হয়ে উঠল আমার কাছে অনেক আদরের। যদিও রাতে আজ পর্যন্ত কোনোদিন এই ঘরে আমি থাকতে পারিনি। তার কারণ ছিল আমার রাতে ভয় পাওয়া আর কিছু পারিবারিক। কলেজে ভর্তির পর আমার আসে একটি মানুষ যে আমার জীবনে আমার বন্ধুর থেকেও বড়। আজ যদিও সে আমার জীবনসঙ্গী হতে চলেছে। সে আমার কবি। এই ঘরটিতে সবার আড়ালে আবডালে চলত প্রেম পর্ব। সারাদিন মনের গভীরে তাঁকে জানার চেনার কৌতুহলের জন্য চলত ফোনে কথা বলা। কিন্তু দুজন দুজনকে চেনার চেয়েও বেশি হত পড়াশুনার কথা, গোপন না জানা কথা, এই সব চলত বিভিন্ন উপমা অলংকরণের মধ্য দিয়ে। আর চলত আমার শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে সচেতনতার পালা। প্রতিরাতে তাঁর সঙ্গে গভীর প্রেমালাপে আচ্ছন্ন হতাম ঘরের খাটের উপর। এখানেই প্রথম ঝগড়া হয় আমার ড্রিঙ্ক করা নিয়ে। ছোটোবেলায় পারিবারিক অনেক ঘটনার জন্য নিজেকে শেষ করার পরিকল্পনা করেছি। কলেজে উঠে suside করতে চেয়েছিলাম, তাতে সে বাধা দিয়েছে। এই ঘরই আমাকে আমার পরিবার থেকে লক্ষ যোজন দূরে নিজেকে বাঁচাতে শিখিয়েছে। এক সময় রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনতাম এখানে বসে। \”আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে\”,\” আমার যাবার সময় হল\”,\” বিদায় যখন চাইবে তোমার দখিন সমীরে\”,\”তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায়\”, \”ও আমার আঁধার ভালো\”,\”তবু মনে রেখো\”,\”আমার যে দিন ভেসে গেছে চোখের জলে\”,\”চোখের জলে লাগল জোয়ার\” ইত্যাদি বিভিন্ন গানকে হৃদয়াঙ্গমে পৌঁছতে গভীর ভাবে উপলব্ধি করতে আর অন্তরঙ্গতায় মেশাতে শিখিয়েছে এই ঘর।
প্রত্যেক বছর শীতের সময় উত্তরের হাওয়ার রুক্ষতা আমাকে জানালার পাশে বসিয়ে রাখত। ওই জানালার পাশে বসে দেখতাম দূরে মাঠে বাচ্চাদের খেলা করা, বয়স্ক মানুষদের রোদ পোহানো, একটু বিকেল গড়াতেই সব নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া।প্রতি দূর্গা পুজোতে এই ঘরে বসে জানালা দিয়ে শরতের খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে পেতাম আগমনী বার্তা, তাতে থাকত খুশি, সফলতা,সুখ।বসন্তের সময় এই জানালা দিয়ে পেতাম প্রকৃতির রঙিন দিনের আলো, যার মধ্যে থাকত প্রেম, দুঃখ, স্বপ্ন আর ভালোবাসা।গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে পেতাম নিস্তব্ধ দুপুর, চারিদিকে নির্জনতা, খাঁ খাঁ করা মাঠ, আর বিকেলে সূর্যাস্তের ম্লান আলো, বাচ্চাদের পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ, তাদের মজা,সাঁতার কাটা ইত্যাদি। বর্ষাকালে এই ঘর হত একটু মায়াবী তখন জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে যত দূর চোখ যেত দেখতাম বর্ষায় দূর অনেক ধূসর, জানালার কার্নিশ থেকে ছন্দে ছন্দে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে জল পড়া, কখনও মুষলধারাতে আবার কখনও ঝির্ ঝির্ শব্দে চলত বৃষ্টির ছন্দ, কখনও বৃষ্টির ঝাঁট এসে ভিজিয়ে দিত আমার মুখ চোখ। মনে করিয়ে দিত তাঁর লেখা কবিতা \’বৃষ্টির ফোঁটা\’। সকালে ছেলেরা জাল দিয়ে পুকুরে মাছ ধরত, মাঠে বাচ্চারা কাদা মেখে ফুটবল খেলত আর পুকুরে ঝাঁপ দিত। রাতে কেউ রেইনকোট পড়ে বা ভিজে ভিজে সাইকেল নিয়ে যে যার কাজ থেকে বাড়ি ফিরত। আর বৈশাখে কালবৈশাখীর ঝড়ের বাতাস আসত এই উত্তরের জানালা দিয়ে। সব কিছু মিলিয়ে ঘরটাতে চলত ঋতুরঙ্গের খেলা। আর সেই সব ঋতুর খেলা চলত আমার মনে প্রানে। যার সবকিছু তাঁকে ফোনে বলতাম এই জানালার পাশে বসে।এই ঘরে বসেই আমি লিখেছিলাম \’আমাতে চির তুমি \’,\’জীবন পথ\’,\’নিশিথ রাতের বাদলধারা\’ ইত্যাদি।
এই ঘরেই আমি বসে আমি চিন্তায় বিভোর হয়ে হারিয়ে যেতাম। আমি অসুস্থ হয়ে পড়তাম, আমার শ্বাসকষ্ট হত বারবার। আর সব কিছুতে সঙ্গ দিত আমার কবি ঠিক আজও যেমনটি ভালোবাসে, যেভাবে সঙ্গ দেয়।
আজ অনেক দিন পরে এই ঘরে বসে মনে পড়ে গেল সেই সব হারিয়ে যাওয়া সুখ, দুঃখের দিনগুলো। মনে পড়ে গেল আমাদের প্রেম ভালোবাসার কথা। আজও যেন এই ঘর আমাকে টানে। আজ এই ঘর যেন তার অনেক দিনের কথা বলে চলেছে আমাকে প্রানে প্রানে বীনার তারে তারে। মনে হচ্ছে সেও যেন হাঁপিয়ে পড়েছে আমাকে ছাড়া।
আজ এই ঘরে আমি থাকিনা। যখন এই ঘরের উত্তরে জানালা খুলে দিলাম যখন উত্তরের হাওয়া এসে ঘরে প্রবেশ করল তখন এই ঘরটি যেন তার পুরোনো প্রান ফিরে পেল। আর আমি এই জানালার পাশে বসে দেখতে পেলাম ঘরের সাথে বাইরের প্রকৃতির ঋতুরঙ্গ।
তাই কবির ভাষায় বলি,_
আজ সেই ঘরে এলায়ে পড়েছে ছবি।
