আমার ছোট্টোবেলার ছড়া

“নীল আকাশে সূয্যিমামা ঝলক দিয়েছে,
সবুজ মাঠে নূতন পাতা গজিয়ে উঠেছে।
পালিয়ে ছিল সোনার টিয়ে, ফিরে এসেছে।
ক্ষীর নদীর কূলে খোকন হাসতে লেগেছে।
হাসতে লেগেছে রে, খোকন নাচতে লেগেছে
মায়ের কোলে চাঁদের হাট ভেঙে পড়েছে।”

ছেলেবেলায় পড়ে আসা ছড়াগুলো আজ যেন স্মৃতিরপাতায় ফুটে উঠল। একটা সময় ছিল মায়ের কাছে বসে সকাল-সন্ধ্যা পড়তাম। দুপুরে খেতে বসে আর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় মায়ের মুখেই প্রথম \’ঈশপের গল্প\’, \’টুনটুনির গল্প\’, \’শেয়াল পন্ডিত\’ এর গল্প শুনতাম।

ছোটোবেলায় পাশের বাড়ির মস্ত উঠানে সকাল বিকাল চলত \’ছোঁয়াছুঁয়ি\’, \’কাকজোড়া\’, \’চু কিত্-কিত্\’, \’কবাডি\’ ইত্যাদি বিভিন্ন খেলা। তবে এরমধ্যে \’লুকোচুরি\’ খেলতে আমার খুব ভয় হতো। ভাবতাম যদি কাউকে খুঁজে না পাই? তাহলে চোর হয়েই থাকতে হবে বা যদি হারিয়ে যাই, যদি বাড়ি ফিরতে না পারি?

বাড়ির পিছনে কুয়োর পাড়ে বসে রান্নাবাটি খেলতাম। তার সাথে ছিল পুতুল খেলা, পুতুলের বিয়ে ইত্যাদি। সব খেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত \’পড়া পড়া খেলা\’। তখন ছাদের গাছগুলো হতো আমার ছাত্র আর আমি হতাম শিক্ষিকা। একই সাথে সাথে সেই খেলায় পড়াতাম-

“কুমোর পাড়ার গোরুর গাড়ি
বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি।”

যখন সকালে ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরি হত তখন কানের কাছে দাদু বলে উঠত-

“ভোর হল       দোর খোলো
খুকুমনি ওঠ রে।
ওই ডাকে       জুঁই শাখে,
ফুলখুকি ছোটো রে।”

একটু বড় হতেই ছেলেবেলার সেই সব ছুটোছুটি আর রান্নাবাটি বাদ দিয়ে সব কিছু ধরা পড়ল গল্পের বইয়ের পাতায়।গল্পের বই পড়া নেশার মত হতে শুরু হলো আমার সাত আট বছরের ছেলেবেলায়। শুরু হল একের পর এক \’টুনটুনির গল্প\’, \’বিক্রম বেতাল\’ দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের \’ঠাকুরমার ঝুলি\’, \’আলতা জবা\’ ইত্যাদি গল্প পড়া। আমি ছেলেবেলা থেকেই আবৃত্তি করতে ভালোবাসতাম। আমার প্রথম আবৃত্তি শুরু হয় সুকুমার রায়ের \’আবোল তাবোল\’ দিয়ে।

ছেলেবেলায় আমার বাড়ির সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল বাড়ির ছাদ। গ্রীষ্মের সময়ে বিকেল বেলা যখন পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলঢল তখন রক্তিম আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে যেত ছেলেবেলায় বইয়ের পাতায় পড়া সেই কবিতা-

“সেথায় আছে ছোট্টো কুটির,
সোনার পাতায় ছাওয়া।
সাঁঝ আকাশে ছড়িয়ে পড়া,
আবির রঙের নাওয়া।”

একটু সন্ধ্যা হতেই ঘরে ঘরে শঙ্খের ধ্বনি আমাকে মুখরিত করে তুলত। চারিদিক থেকে ধূপ ধূনোর গন্ধে যেন সন্ধ্যা নেমে আসত আমার ছাদের উপরে। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘের খেলা। মনে হত মেঘের মধ্যে কোনো একটা গ্রাম বাংলার ছায়া পশ্চিম আকাশকে ঘিরে ধরেছে। সেখানে রয়েছে কত পাহাড় পর্বত, কত ছোটো ছোটো মানুষ। একটু গাঢ় সন্ধ্যে হতেই যখন পুব আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠত তখন বাড়ির চারপাশের সুপুরি গাছের, সামনের বাগানের মেহগনি, সেগুন, নারকেল ইত্যাদি গাছের ছায়া খেলা করতে আসত ছাদের উপরে। তখন নীচের বাগানে গাঢ় অন্ধকার। যখন ছাদে গাছের দুটি ডালের ফাঁক দিয়ে পূর্ণিমার জ্যোৎস্না এসে পড়ত আমার কপালে মুখে, মনে পড়ে যেত ছেলেবেলায় মায়ের মুখে শোনা সেই ছড়া-

“আয় আয় চাঁদমামা
টি দিয়ে যা।”

কখনও মনে পড়ে যেত সেই রূপকথার রাজপুত্রের কথা। কখনও কখনও ভাবতাম এই বুঝি রাজপুত্র তার পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়ে চাঁদের পাশ দিয়ে এসে আমাকে স্বপ্নপুরীর রাজ্যে নিয়ে যাবে। আবার বর্ষাকালে দোতলার মাঝের ঘরে জানালার ধারে বসে কার্নিশ থেকে ছন্দে ছন্দে জল ঝরে পড়তে দেখতাম কখনও টুপটাপ ছন্দে, কখনও বা মুষলধারে। আবার শরৎকালে বাড়ির পিছনের মাঠে একটু কাশফুলের শোভাতে এবং নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলাতে দেবীর আগমন যেন বর্ষিত হত আমার মনে প্রাণে। বসন্তে ছাদের উপর চন্দ্রমল্লিকা ফুলের শোভায় যেন মিশে যেত আমার ছেলেবেলা। বৈশাখী বিকেলে আকাশ ঘিরে মেঘ করে আসত, পড়াশুনা ছেড়ে আমি ছাদের উপর ওই কালো ধূসর মেঘের ফাঁকে সাদা পায়রা উড়ে যাওয়া দেখতাম। একটু বাতাস জোরে দিলেই ছাদের উপরে সবচেয়ে উঁচু জায়গায় দুদিকে হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের মনেও কালবৈশাখীর ঝড় তুলে দিতাম। তার সাথে চলত বিদ্যুৎ এর খেলা, বজ্রপাত।আমার ভাই ভয় পেয়ে সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে বলত, \’দিদি আমাকে হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।\’ আর দাদু ভয় পেয়ে বলত, \’এই ময়না, নীচে আয় বাজ পড়ছে।\’ কিন্তু কে কার কথা শোনে! আমি চলতাম আমার আপন খেয়ালে। ছেলেবেলায় যখন রাতের বেলায় ঘুমাতে যেতাম তখন খুব সাজগোজ করে চুল বেঁধে, চোখে কাজল পরে ঘুমাতাম। ভাবতাম যদি আজ স্বপ্নে দেখা \’আলতা জবা\’ গল্পের রাজপুত্রটি আমাকে দেখতে আসে! এইভাবেই রঙিন হয়ে প্রতিটি ঋতু খেলা করত আমার ছেলেবেলায়। প্রতিটি ঋতু খেলা করত আমার ছাদে মনে প্রাণে।

আজও মনে পড়ে যায়,
আমার স্বপ্ন ভেলা।
স্মৃতির পাতাতে থেকে যায়,
আমার ছেলেবেলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *